Connect with us

Hi, what are you looking for?

Newsbd71Newsbd71

সারাদেশ

নিঝুম দ্বীপে জোয়ারে ভাসছে হরিণ

নোয়াখালী : নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া। এই উপজেলার আওতাধীন নিঝুম দ্বীপের চারপাশে বেড়িবাঁধ না থাকায় জোয়ারের সময় দ্বীপটি তলিয়ে যায় ৪/৫ ফুট পানির নিচে। ফলে এসময় চারদিক থেকে আসা অস্বাভাবিক জোয়ারে বন্দরটিলা, নামার বাজার, বৌ-বাজার, হরিণবাজার, ডুবাই খাল, শতফুল ও ছায়াবীথিসহ বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে তলিয়ে যায় জাতীয় উদ্যানটিও। এই জাতীয় উদ্যানে এখন উঁচু কোনও আশ্রয়স্থল না থাকায় দ্বীপ বনটিতে থাকা হরিণগুলো প্রতিদিনই জোয়ারের পানিতে ভিজে যাচ্ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রাণীগুলোর বিচরণ। এমনকি পানিতে ভেসে আসার অন্য প্রাণী, জীবানু ইত্যাদির দ্বারা হরিণগুলো সংক্রমিত হওয়ার ভয় থাকছে। বিশেষ করে বর্ষা বন্যার পানি সাগারে নামার এই জুলাই থেকে অক্টোবর মাসে এসব প্রাণী অতিরিক্ত উঁচু জোয়ারের কারণে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। বিপদে আশ্রয় নেয়ার মতো কোনও জায়গা না থাকায় প্রাণীগুলো প্রাণ বাঁচাতে লোকালয়ের উঁচু এলাকায় চলে এসেছে।

নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান রক্ষায় গঠিত ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ডাক্তার বেলাল উদ্দিন জানান, নিঝুম দ্বীপে হরিণের জন্য বনের মধ্যে চৌধুরী ক্যাম্প এলাকায় ১৯৮২ সালে একটি মাটির কিল্লা তৈরি করা হয়। বিভিন্ন সময় প্লাবনে এখন তা অনেকটা সমতলের সঙ্গে মিশে গেছে। এটি এখন আর হরিণের আশ্রয়ের কাজে আসে না। বর্তমানে বনের মধ্যে বনবিভাগ কর্তৃক তৈরি কয়েকটি পুকুরের পাড় ছাড়া অস্বাভাবিক জোয়ারের সময় হরিণগুলো আশ্রয় নেওয়ার মতো আর কোনও জায়গা নেই। যা বর্তমানের হরিণের সংখ্যার তুলনায় অপ্রতুল। কিন্তু এবারের জোয়ারে অনেক হরিণ বন বিভাগের তৈরি জায়গা ছাড়াও লোকালয়ের উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। পানি সরে গেলে হরিণগুলো আবার বনে ফিরছে বটে তবে মাঝেমধ্যে শিয়াল ও কুকুর হরিণগুলোকে তাড়া করে।
তিনি দাবি করেন, এলাকার মানুষ এবার হরিণ রক্ষায় সচেতন রয়েছে।   
নিঝুম দ্বীপকে পর্যটকমুখী করার লক্ষ্যে কাজ করা স্থানীয় এনজিও দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক রফিকুল আলম বলেন, ২০১২ সালে কয়েকটি এনজিওকে সঙ্গে নিয়ে নিঝুম দ্বীপের হরিণের ওপর একটি জরিপ করা হয়েছে। এতে আমরা এ দ্বীপের হরিণকে বাঁচাতে হলে চারটি বিষয়ে কাজ করার জন্য সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে জমা দেই। সুপারিশমালায় প্রস্তাব ছিল উঁচু জায়গা নির্মাণ (কিল্লা), কুকুর নিধন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা ও বনের নিরাপত্তা বেস্টনী তৈরি করা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও অস্বাভাবিক জোয়ারে বেড়িবাঁধবিহীন হাতিয়ার বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন নিঝুম দ্বীপ জোয়ারের পানিতে ভয়াবহভাবে প্লাবিত হয়েছে। বনের মধ্যে ৪/৫ ফুট পানি, কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা নেই, জীবন বাঁচাতে কখনও লোকালয়ে, কখনো সাঁতার কেটে অন্য চরে আশ্রয় নিচ্ছে এই দ্বীপের হরিণগুলো। আবার লোকালয়ে আশ্রয় নেওয়া হরিণের ওপর কুকুর ও শিয়ালের আক্রমণ দেখা যায়। এতে অনেকটা শূন্য হতে চলেছে হাতিয়ার পর্যটন সম্ভাবনাময়ী নিঝুম দ্বীপের প্রধান আকর্ষন হরিণগুলো।  বনের মধ্যে উঁচু জায়গা না থাকায় ভেসে গেছে অনেক হরিণ। হরিণসহ নিঝুম দ্বীপের পর্যটন সম্ভবনাকে বাঁচিয়ে রাখতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি স্থানীয়দের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জোয়ারে দ্বীপের চৌধুরী খালের পাশে নতুন সৃজিত ৫০ হেক্টর বনের আংশিক গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া নিঝুম দ্বীপ ও জাহাজমারা ইউনিয়নের ১০টি চরের জাতীয় উদ্যানে প্রায় ৪০ হাজার ৩শ’ ৯০ একর বনভূমিতে প্রায় ৪/৫ ফুট পানি উঠে যায়। এ সময় বনের ভেতরে থাকা প্রায় হরিণের দল জাতীয় উদ্যানে নির্মিত পুকুরের পাড় ও লোকালয়ে উঁচু জায়গায় উঠে আসে। তবে, জোয়ারে বিভিন্ন সময় হাতিয়ার চর কালাম, সাগরিয়ার চর, দমার চর, চর রৌশন, চর ইউনুস, ঘাষিয়ার চর, মৌলভীর চর, জাহাজমারা এবং ভোলা জেলার মনপুরা উপজেলার কালকিনির চর ও হিরণচর সহ বিভিন্ন চরে হরিণের আবাসস্থল রয়েছে। বর্তমানে এই দ্বীপের বনে প্রায় ৩/৪ হাজার হরিণ রয়েছে।

নিঝুম দ্বীপের বনপ্রহরী বাছির উদ্দিন (৫৫) বলেন, গত কয়েক দিনের বৃষ্টি ও অমাবশ্যায় জোয়ারের পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পর থেকে হরিণের পাল ছোয়াখালী এলাকা দিয়ে লোকালয়ে বন্দরটিলা নামার বাজার প্রধান সড়কের ওপরে চলে আসে। এসময় অনেক হরিণকে কুকুর ও শেয়ালের আক্রমণের শিকার হতে দেখা যায়। রাতে জোয়ার হলেও একইভাবে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেওয়া হরিণের পালকে কুকুর ও শিয়ালের আক্রমণের শিকার হতে হয়।
নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহরাজ উদ্দিন জানান, অন্যান্য বছরের চেয়ে এবারের অমাবস্যার অস্বাভাবিক জোয়ারে বেড়িবাঁধ না থাকায় লোকালয়ে চলে এসেছে হরিণের দল। এভাবে অস্বাভাবিক জোয়ার অব্যাহত থাকলে নিঝুম দ্বীপের প্রধান আকর্ষণ হরিণের ব্যাপক ক্ষতি হবে। বেড়িবাঁধ তৈরি নিয়ে বারবার উপজেলা সমন্বয় সভায় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলার পরও কোন কাজ হচ্ছে না। পর্যটন এলাকা নিঝুম দ্বীপের হরিণ বাঁচাতে হলে জরুরি ভিত্তিতে বেড়ি বাঁধ এবং উঁচু মাটির কিল্লা দরকার। কারণ, হরিণ হারিয়ে গেলে পর্যটনশূন্য হবে নিঝুম দ্বীপ।
তিনি আরও জানান, বঙ্গোপসাগর ও মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা ৮১ বর্গ কিলোমিটারের এ দ্বীপের চারপাশে কোনও বেড়িবাঁধ নেই। যার কারণে দ্বীপের ৫৭ হাজার বাসিন্দা জোয়ার ভাটার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছে। গত কয়েক দিন ধরে চলা অস্বাভাবিক জোয়ারে প্রায় তিন হাজার গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়া এবং পুকুর ও ঘেরের অন্তত তিন কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। বাড়িঘরে কোমর পরিমাণ পানি জমে থাকায় অনেক পরিবার উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। তীব্র জোয়ারের তোড়ে সবগুলো কাঁচা এবং পাকা সড়ক বিধ্বস্ত হওয়ায় দ্বীপের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকারিভাবে চার মেট্রিক টন জিআর চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। এই পরিস্থিতিতে নিজ উদ্যেগে দুই হাজার পরিবারের মাঝে চিড়া মুড়ি পৌঁছে দেন। এছাড়া, জরুরি ভিত্তিতে কাঁচা-পাকা রাস্তা সংস্কার, দুঃস্থদের বাসস্থান মেরামত ও দ্বীপের চারদিকে বেড়িবাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানান তিনি।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন স্বীকার করেন, হাতিয়ার সাড়ে ৭ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কোনও বেড়িবাঁধ নেই। এছাড়া আমফানের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে রাজস্ব খাতের অর্থে নতুন সাড়ে ৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হবে। এছাড়া পুরো হাতিয়া উপজেলায় নদীভাঙন রোধ, বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের জন্য ২১শ’ ৩২ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রেজাউল করিম জানান, টানা বৃষ্টি ও অস্বাভাবিক জোয়ারে বেড়িবাঁধ ভেঙে ১১টি ইউনিয়নের অন্তত ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। জোয়ারে ভেসে গেছে বসতঘর, দোকানপাট, পুকুরের মাছ ও নষ্ট হয়েছে আউশ ধান।
হাতিয়ার সংসদ সদস্য আয়েশা ফেরদাউস জানান, অনেক এলাকায় বেড়িবাঁধ না থাকায় এবং এ বছর আমফানের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ মেরামত না করায় অস্বাভাবিক জোয়ারে মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। নতুন বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ মেরামত দ্রুত না করা গেলে মানুষকে দুর্ভোগের হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না।

নিউজবিডি৭১/ এম কে / ২৮ আগস্ট ২০২০

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুকে ২৪ লক্ষের পরিবার

বাংলাদেশ

ইসলাম

নূর হোসাইন: জামিয়াতুন নূর আল কাসেমিয়ার আরবী সাহিত্য বিভাগের উদ্যোগে আরবি দেওয়ালিকা ‘আন-নূর’ প্রকাশিত হয়েছে। শনিবার (১৮ ডিসেম্বর) বিকাল ৫টায় আনুষ্ঠানিকভাবে দেয়ালিকার মোড়ক উন্মোচন...

কপিরাইট Ⓒ ২০১২-২০২১ নিউজবিডি৭১.নেট । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। বাড়ী- ৪৯ (১ম তলা), রোড- ১২, সেক্টর-১১, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০, বাংলাদেশ। প্রকাশক- মোহাম্মদ মানিক খান