মোঃ আবদুল আউয়াল সরকার :

মেধাকে সঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পারলেই তাকে আমরা মেধাবী বলি। অনেক সময়ে সঠিক পরিবেশ ও পরিচর্যার অভাবে অনেক মেধাবীকেই মেধাহীনের অপবাদ সহ্য করতে হয়।

প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় একটি সমস্যা হল, সবার জন্য একটিই শিক্ষার মডেল। এক সাইজের জামা সবাইকে পরতে বাধ্য করা হয়। সেই জামা যার ফিট করে না, তাকেই মেধাহীন হিসেবে ধরে নেয়া হয়।

সাধারণ ভাবে মেধা বলতে আমরা বুঝি কোনওকিছু শেখার ক্ষমতা ও সেই শিক্ষাকে সৃষ্টিশীলতা ও সার্থকতার সাথে কাজে লাগানোর ক্ষমতা।

মেধাবী তাদেরই বলা হয়, যাদের মেধা বিকশিত হয়। অর্থা‌ৎ মেধাবী হওয়া মানে নিজের মেধাকে বিকশিত করা।
সবার মেধা একভাবে বিকশিত হয় না। মানুষের মেধা বিভিন্ন ভাবে বিকশিত হয়। সবার মাঝেই সবকিছু শেখার ও সবকিছু নিয়ে কাজ করার যোগ্যতা আছে – কিন্তু সবার শেখার ধরন ও আদর্শ কৌশল এক নয়।

মানুষেরা চোখের সামনে দেখা জিনিস বেশি মনে রাখতে পারে। চোখে দেখা কোনও ঘটনা, মানুষ বা দৃশ্য তারা খুব সুন্দর করে মনে রাখতে পারে। যদি দেখেন ভালোমত মনে করতে পারছেন না, তখন লেকচার শুনতে শুনতে, বা পড়তে পড়তে একই সময়ে সেই শিক্ষাগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন।চেষ্টা করুন, পড়া, শোনা, বা দেখার পাশাপাশি একই সময়ে সেই কাজগুলো করার। পড়াশুনার ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন। বইয়ের পড়াগুলো পড়ে ও লিখে বোঝার চেস্টা করুন। মনোযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করুন।

শ্রেণিকক্ষে ক্লাস চলাকালে আমরা প্রায়ই অমনোযোগী হয়ে পড়ি। মাঝে মাঝে ঘুমও পায়। কখনো কখনো শিক্ষকের কথা শুনতে পাই না। ফলে শিক্ষক কী পড়াচ্ছেন তা আর আমাদের বোধগম্য হয় না। অনেক সময় অর্ধেক বুঝতে পারলেও বাকি অর্ধেক বোঝার ইচ্ছা থাকে না। আর যদি পুরোটাই অমনোযোগী থাকি তাহলে তো কথাই নেই। আমার কথাগুলো নিশ্চয়ই অনেকের সঙ্গেই মিলে যাচ্ছে।

যেহেতু শ্রেণিকক্ষে আমরা মনোযোগ দিতে পারছি না, তাই বাসায় গিয়ে পড়তে বসে বা পরীক্ষার আগে সেগুলোকে নতুন মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর তখন পড়াগুলো আবার নিজে নিজে পড়তে হয়। নিজে নিজেই যদি সবকিছু পড়া যেত তাহলে কখনোই বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ত না। বাজার থেকে বই কিনে নিয়ে সরাসরি পরীক্ষায় বসে যাওয়ার পদ্ধতি থাকত।
আবার যেহেতু শিক্ষকের কথায় মনোযোগ দিতে পারছি না, নিজে পড়েও কিছু বুঝতে পারছি না, সেহেতু আমরা হয় তখন বই মুখস্থ করছি না হয় দ্বারস্থ হচ্ছি দ্বিতীয় বিদ্যালয়—কোচিং সেন্টার বা বহু ছাত্রবিশিষ্ট প্রাইভেট সেন্টারের। মুখস্থ বিদ্যার কুফল নিয়ে নাই বা বললাম। আসি কোচিং সেন্টারের কথায়। কোচিং সেন্টারগুলো যেহেতু অনেক টাকার বিনিময়ে তাদের শিকার ধরে, তাই সেখানে নিজ দায়িত্বে লেখাপড়াটা কিলিয়ে গিলিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়। সেখানেও যারা অমনোযোগী থাকে তাদের তৃতীয় বিদ্যালয় বাসার শিক্ষকের সম্মুখীন হতে হয়। সেখানেও মনোযোগের অভাব হলে ফলাফলের জায়গাটা বেশ ফাঁকাই পড়ে থাকে। অবশেষে নাম ঢুকে যায় খারাপ ছাত্রের তালিকায়।

আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেকের মেধা সমান। প্রত্যেকেই যোগ্যতা রাখে তথাকথিত ভালো ছাত্র হওয়ার। তাহলে এর সমাধান কি?
বিভিন্ন ধরনের বিদ্যালয়ের যে ধাপগুলো এখানে বললাম তার পেছনের অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অমনোযোগিতা। ব্যাপারটা এখন এতটাই গুরুতর যে, কোচিং সেন্টার ও বাসায় শিক্ষক থাকার ফলে বাচ্চারা এখন আর শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাই মনে করে না। এতে যে বাচ্চাদেরই শুধু ক্ষতি হচ্ছে তাই নয়, অপমানবোধে ভোগেন অনেক শিক্ষকও। অথচ শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দিলে সময় ও অর্থ নষ্টকারী দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিদ্যালয়গুলোর দ্বারস্থ হতে হয় না আমাদের।

অমনোযোগের প্রধান কারণ হচ্ছে পেছনের দিকে বসা। পেছনে বসার ফলে অনেকের আড়ালে থেকে থেকে ফুল–পাখি–লতা পাতা দেখা ও আঁকার মতো আরও অনেক অপ্রাসঙ্গিক কাজ করা হয়ে থাকে। ফলস্বরূপ দিন দিন পিছিয়ে পড়তে হয়। গড়ে উঠে ফার্স্ট বেঞ্চ-লাস্ট বেঞ্চ বৈষম্য।

মনোযোগ বাড়ানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে তাই সামনের সারিতে বসা। বিশ্বাস হচ্ছে না? একদিন বসে দেখো, টনিকের মতো কাজ করবে। বলতেই পারো, সবাই যদি প্রথমে বসতে চায় তাহলে জায়গা হবে কেমন করে? তাদের জন্য বলছি, সবাই কি আমার কথাগুলো পড়বে? যদিও বা পড়ে, বিশ্বাস করবে? করবে না। তো, কাল থেকে প্রথম সারির প্রথম সিটটা তোমার। আজ যদি তুমি মাঝারি বা শেষের সারির ছাত্র হয়ে থাকো, কাল থেকে ভালো ছাত্রের তকমাটা অপেক্ষা করবে তোমার জন্য।