নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

 

সাড়ে ১৮ মিনিটের ভাষণ, যাতে উঠে আসে বাঙালির স্বাধীনতার দিক-নিদের্শনা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই ভাষণের ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে এ বছর।

ইতোমধ্যেই ভাষণটি ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও ভিডিও ফুটেজ দেখে বোঝা যায়, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল রেসকোর্স ময়দান (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। সেদিনের সেই ভাষণ শুধু বাঙালির স্বাধীনতার ঘোষণাই ছিল না, ছিল এক অনবদ্য কাব্য। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু কী বলেছিলেন, সেই ভাষণের দিক-নির্দেশনায় বাঙালি জাতি যে মরণপণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল, তা আজ আর কারও অজানা নয়।

কিন্তু সেদিনটি কেমন কেটেছিল বঙ্গবন্ধুর? কীরূপ প্রস্তুতি ছিল তার ভাষণের আগে—এ কথাগুলো এখনও অনেকেরই অজানা। তেমনি অজানা, সেদিন রাতের কথাও।

সকালে দলীয় নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক-
একাত্তরের ৭ মার্চ সকাল থেকেই ৩২ নম্বরে ঐতিহাসিক ভবনে ভিড় জমাতে শুরু করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বঙ্গবন্ধুর জামাতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া তার স্মৃতি কথায় লেখেন, “ঐদিন বঙ্গবন্ধু তার বাসভবনের লাইব্রেরি কক্ষে তাজউদ্দিন আহমদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, ড. কামাল হোসেনসহ আরো কয়েকজনকে নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অংশ নেন। ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকের পর বঙ্গবন্ধু সবাইকে বলেন, ছাত্রজনতার দাবির সাথে তারা একমত পোষণ করেছেন এবং বিকেলে রেসকোর্সে চার দফার দাবি পেশ করা হবে।

আলোচনা শেষে তিনি ড. কামাল হোসেনকে চার দফার খসড়া তৈরি করতে বলেন। দুপুরের খাবারের পর তিনি বিশ্রাম নেওয়ার সময়, তাকে চূড়ান্ত কপিটি দেখানো হয়। কপিটি টাইপ করেছিলেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফ।

সেই চার দফা কী ছিলো?
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মোতাবেক ড. কামাল হোসেনের করা চার দফার কোনো ছাপই ছিল না ভাষণে। ঘোষণাপত্র প্রসঙ্গটি বিস্তারিত উঠে এসেছে এম এ ওয়াজেদ আলীর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে। সেদিন ৭ মার্চে ঘোষণাপত্রের চূড়ান্ত কপিটি মিলিয়ে দেখার এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু খন্দকার মোশতাককে জিজ্ঞেস করেন যে, ‘ইশতেহারে স্বাধীনতার ঘোষণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে কি না’। খন্দকার মোশতাক বলেন, ‘সামরিক শাসনের ক্ষমতাবলে জারিকৃত আইনগত কাঠামোর অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ঢাকায় বসে পাকিস্তানের অখণ্ডতা লঙ্ঘন সংক্রান্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করার ব্যাপারটি খুব ঝুঁকিপূর্ণ। সুতরাং, এই ব্যাপারটা ইশতেহারে লেখা হয়নি।

সেদিনের ইশতেহারে ইয়াহিয়া খানের কাছে চার দফা দাবি করা হয়। দাবিগুলো হলো: ১. সামরিক বাহিনীর সমস্ত লোককে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে। ২. পহেলা মার্চ হতে আন্দোলনে যে সমস্ত ভাইবোনকে হত্যা করা হয়েছে, সে বিষয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিশন গঠনের মাধ্যমে তদন্ত করে সে ব্যাপারে দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। ৩. সামরিক আইন অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। ৪. অবিলম্বে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দলের নেতার কাছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

রেসকোর্সের পথে- রেসকোর্সে রওনা হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু কয়েকজন নেতাকর্মীকে ডেকে বলেন, ‘চার দফার এই ইশতেহারটি দেশি ও বিদেশি সাংবাদিকদের মাঝে বিলি করবে’। এই বলে তিনি একটি ট্রাকে উঠে যাত্রা শুরু করেন। এ সময় সেই ট্রাকে ছিলেন তৎকালীন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি গাজী গোলাম মোস্তফা, শেখ ফজলুল হক মণি, ছাত্রলীগের প্রাক্তন সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল কুদ্দুস মাখন, সিরাজুল আলম খান (দাদাভাই) প্রমুখ।

পাশের আরেকটি ট্রাকে ছিলেন মোস্তফা মহসীন মন্টু, কামরুল আলম খসরু, মহিউদ্দিন, আ স ম আবদুর রব ও শাহজাহান সিরাজসহ অন্যান্য নেতাকর্মীরা।

হঠাৎ করে বন্ধ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সম্প্রচার- সেদিন রেসকোর্সে নৌকা আকৃতির সভামঞ্চটি স্থাপন করা হয়েছিল বর্তমান শিশুপার্কের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে। বঙ্গবন্ধু বেরিয়ে যাওয়ার পর একটি গাড়ি নিয়ে শেখ হাসিনাসহ অন্যদের সঙ্গে যাত্রা করেন ওয়াজেদ মিয়া। মঞ্চের কাছাকাছি পৌঁছে শেখ হাসিনা রেডিও চালু করতে বলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্প্রচারের কথা এ সময় রেডিওতে বারবার ঘোষণা করা হচ্ছিল। কিন্তু ভাষণ শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সম্প্রচারের অনুমতি থাকার পরেও সরকারের তাৎক্ষণিক নির্দেশে ভাষণ সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেদিন রাতে ইকবাল বাহার চৌধুরীর নেতৃত্বে রেডিও পাকিস্তান কেন্দ্রের সকল কর্মকর্তা ৩২ নম্বরের বাসায় এসে বঙ্গবন্ধুকে জানান যে, এ ভাষণ সম্প্রচার করতে না দেওয়া পর্যন্ত তারা কাজে যোগ দেবেন না।

৭ মার্চ রেডিও পাকিস্তানের সব অনুষ্ঠান বন্ধ ছিল। ৮ মার্চ সকাল ৮টায় পাকিস্তান রেডিও ঢাকা কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হয় যে, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ভাষণ হুবহু সকাল ৯টায় প্রচার করা হবে।

এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “রেডিওর ঘোষকরা আগে থেকেই রেসকোর্স থেকে ইস্পাত দৃঢ় দর্শকের নজিরবিহীন উদ্দীপনার কথা প্রচার করতে শুরু করে। এই ব্যাপারে সামরিক আইন প্রশাসকের দপ্তর হস্তক্ষেপ করে এই বাজে ব্যাপারটি বন্ধের নির্দেশ দেন। সে কথা মতো আমি রেডিও কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিই। আদেশটি শুনে টেলিফোনের ওপারে থাকা বাঙালি অফিসার আমাকে বলেন, ‘আমরা যদি সাড়ে সাত কোটি জনগণের কণ্ঠ প্রচার করতে না পারি তাহলে আমরা কাজই করব না’। এই কথার সাথে সাথে বেতার কেন্দ্র নীরব হয়ে যায়।

দু’বেলা আমার সঙ্গে খাবে- রেসকোর্স ময়দানে সেই ঐতিহাসিক ভাষণ শেষে রাতে বঙ্গবন্ধু পুরো পরিবারকে সাথে নিয়ে রাতের খাবার খেতে বসেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, শেখ হাসিনা, ওয়াজেদ মিয়া, শেখ কামাল, শেখ জামাল, রেহানা, রাসেল, শেখ শহীদ।

পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে এ সময় বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমার যা বলার ছিল আজকের জনসভায় তা প্রকাশ্যে বলে ফেলেছি। সরকার এখন আমাকে যে কোনো মুহূর্তে গ্রেপ্তার করতে পারে। সেজন্য আজ থেকে তোমরা প্রতিদিন দু’বেলা আমার সঙ্গে খাবে। সেদিন থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত প্রতিদিন বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবার তার সঙ্গে খেয়েছে।